মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলা ব্র্যান্ডিং

১. পটভূমি:
 
বাংলাদেশের বৃহত্তর উত্তর জনপদের একটি জেলা কুড়িগ্রাম। এ জেলার যেমন আছে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস, তেমনি আছে এর ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা। সুদীর্ঘ সময়ের চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গড়ে উঠেছে এ জেলার মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীবন যাপন পদ্ধতি। এখানে ভাওয়াইয়া গানের সুর মানুষের জীবনের সাথে মিশে আছে। এ জেলার ভাওয়াইয়া গান আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করেছে । ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’ এ রকম হাজারো ভাওয়াইয়া গানের চারণভূমি এ জেলা। এ জেলার মানুষের মুখের ভাষায়, হৃদ-স্পন্দনে ভাওয়াইয়া গান অনুরণিত হয়ে চলেছে। এ জেলার উপর দিয়ে বহমান ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমর, ফুলকুমরসহ ১৬টি নদ-নদী এ ভাওয়াইয়া গানের উৎস। ভাওয়াইয়া গান নদ-নদীময় এ জেলাকে সমৃদ্ধ করেছে, পরিণত করেছে এক ঐতিহ্যময় সাংস্কৃতিক লীলাভূমিতে। নদ-নদীগুলোর দ্রুত গতিপথ পরিবর্তনের মত ভাঙ্গা সুরের এ গান মানুষের জীবন যাত্রাকে প্রভাবিত করে চলেছে। তাই গতিশীল এ সকল নদ-নদী আর সুমধুর ভাওয়াইয়া গান এ জেলাকে করেছে সব জেলা থেকে স্বতন্ত্র এক সম্ভাবনার স্থান। 
 
২. কুড়িগ্রাম জেলা ব্র্যান্ডিং এর বিষয় নির্বাচন:
 
ভাওয়াইয়া গান কুড়িগ্রাম জেলার প্রাণ। ভাবের যে গান সেটাই ভাওয়াইয়া। এ গানে বলা হয়েছে স্থানীয়দের পেশা-জীবিকা ও পতির জন্যে নারী মনের আকুতিও। নিজস্ব ঢং আর রীতিতে পরিবেশনের মাধ্যমে মানুষের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ গান।  আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এ লোকগানের উপজীব্য বিষয় নদী, নারী ও প্রকৃতি। প্রায় বেশিরভাগ ভাওয়াইয়া গানে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা নদীর কথা উঠে এসেছে। কোন একক জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ সংখ্যক আন্তর্জাতিক নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে এ জেলার উপর দিয়ে। ভাওয়াইয়া গানেরও আদি আবাসভূমি এ জেলা। এ দুটি বিষয়কে সামনে রেখেই জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান হিসাবে “ভাওয়াইয়া গানের ধাম, নদ-নদীময় কুড়িগ্রাম” নির্ধারণ করা হয়েছে। 
 
৩. জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের লক্ষ্য ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল:
উদ্দেশ্য/লক্ষ্য:
 
• ভাওয়াইয়া গান সংরক্ষণ ও জনপ্রিয়করণ;
• জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির লালন ও বিকাশ;
• জেলার সর্বস্তরের অধিবাসীকে ভাওয়াইয়া ও নদীরক্ষায় শামিল করা এবং সামাজিক সংহতি সুদৃঢ়করণ;
• ভাইয়াইয়া গানের মাধ্যমে এ জেলাকে দেশের সকল অঞ্চলে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলা;
• ভাওয়াইয়া গানের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে দেশের বাইরে বাংলা ভাষা-ভাষীদের নতুনভাবে অবস্থান সৃষ্টির প্রয়াস;
• যথাযথ নদ-নদী ব্যবস্থাপনা; 
• নদ-নদীকেন্দ্রিক কর্মকান্ডে গতিশীলতা আনয়ন।
 
 
কাঙ্ক্ষিত ফলাফল:
• কুড়িগ্রাম জেলাকে ভাওয়াইয়া গানের অনন্য স্থান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন;
• আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কুড়িগ্রামকে ভাওয়াইয়ার স্থান হিসেবে দৃঢ় অবস্থান অর্জন;
• ভাওয়াইয়া গানের বিকাশ;
• প্রবাহমান সুসংহত নদ-নদী; 
• মানুষের জীবনমান উন্নয়ন;
• চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
 
৪. লোগো ও ট্যাগলাইন:                                 
                                                     
                                    
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, .......  হাকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’ বাংলা গানের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক সংযোজন। নদীর কূল ধরে মেঠো পথে চলতে থাকা ভাওয়াইয়া গানের গাড়িয়াল ভাইয়ের গরুর গাড়ি আর বহমান নদীর নিত্য অনুষঙ্গ নৌকা সম্বলিত চিত্ররূপময় একটি প্রতিরূপকে জেলা-ব্র্যান্ডিংয়ের লোগো হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। 
ট্যাগ-লাইনটি নিম্নরূপ:
‘ভাওয়াইয়া গানের ধাম 
  নদ-নদীময় কুড়িগ্রাম’
 
এ ট্যাগ-লাইনটির মর্মার্থ হলো- ভাওয়াইয়া গান ও নদ-নদীর মাধ্যমে কুড়িগ্রাম পরিচিতি লাভ করবে এবং একটি কর্ম-পরিকল্পনার মাধ্যমে ভাওয়াইয়া গান সংরক্ষণ ও নদ-নদীগুলোকে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্যভাবে কাজে লাগানো হবে।
৫. কুড়িগ্রাম জেলার ভাওয়াইয়া ও নদ-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ: 
ভাওয়াইয়া গানগুলো সংরক্ষণের প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকলেও সমন্বিত উদ্যোগের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। কয়েক দশক আগেও এ জেলার গ্রামীণ হাট-বাজারগুলোতে বসত ভাওয়াইয়া গানের আসর, দোতারা হাতে ভাওয়াইয়া শিল্পী গান গাইত। কিন্তু আগের মত দোতারা হাতে ভাওয়াইয়া শিল্পীদের গান গাইতে খুব বেশি আর দেখা যায় না। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সহমর্মিতা জীবনবোধ সর্বোপরি মানুষের উদ্দীপিত প্রাণশক্তি জাগ্রত করার এক মোহনীয় ক্ষমতা রয়েছে এসব গানের । কিন্তু শহুরে মানসিকতা আর নাগরিক সংস্কৃতির আধিপাত্যের কারণেই বর্তমানে এই গানগুলোর উপস্থিতি কিছুটা কমেছে। যদিও নগরকেন্দ্রিক জীবনধারা এ গানের উপস্থিতি কিছুটা ম্লান করেছে তবুও এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এর আবেদন আগের মতই রয়েছে। কিন্তু এসব ভাওয়াইয়া গান সংরক্ষণের নেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পিত কোন উদ্যোগ। গবেষকদের আন্তরিক পদক্ষেপও তেমন পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। 
 
এ জেলার নদ-নদীরগুলোর নাব্য অনেক কমে গিয়েছে। উজান থেকে বয়ে আসা পলিমাটিতে নদীগুলো অনেকটা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুকনো মৌসুমে পানি কমে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ অন্যান্য নদ-নদীর বুকে নতুন নতুন অনেক চর জেগে উঠছে। নদীর গতিপথ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নদীগুলোর ভাঙ্গনে জেলার বিভিন্ন জনপদের ভূ-ভাগে পরিবর্তন আসছে।  এসব কারণে নদ-নদীগুলোকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা বিশেষ বৈশিষ্টে আবর্তিত।
৬. সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রটির শক্তি, দুর্বলতা, সুযোগ, ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ:
 
ক) সবল দিক:
 
ভাওয়াইয়া গানের স্রষ্টা, শিষ্য, পৃষ্ঠপোষকদের আবাসভূমি: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ও প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের সাথে তিনটি রাজ্যের সীমান্তঘেষা এই কুড়িগ্রাম জেলাকে ভাওয়াইয়া গানের জেলা বলা হয় । কছিম উদ্দিন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত ভাওয়াইয়া গানের একজন অন্যতম প্রধান শিল্পী। ভাওয়াইয়া গানের মহান শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের পর তাকেই এ গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং ‘ভাওয়াইয়া গানের যুবরাজ' বলে সম্বোধন করা হয়। ভাওয়াইয়া যুবরাজ কছিম উদ্দিনের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলায়।
 
গানগুলো মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত: এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এখনো ভাওয়াইয়া গানগুলোর কম-বেশি প্রচলন রয়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানে এ গানগুলোর চর্চা ও শ্রবণ তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হলেও কুড়িগ্রাম জেলার শিল্পী ও সাধারণ মানুষেরা এখনো এ গানগুলোকে চর্চার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছে।  
ভাওয়াইয়া গানের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির অকৃত্রিম প্রকাশ: উত্তর জনপদ ভাওয়াইয়া গানের প্রাণকেন্দ্র। ভাওয়াইয়া গান অবিরাম বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে প্রাণশক্তি যুগিয়েছে। ভাওয়াইয়া মূলত ভাবপ্রধান গান। ভাব শব্দ হতে ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি। মানুষ নিজের মনের ভাব তথা সুখ-দুঃখের কথা গানের সুরে প্রকাশ করে থাকে। 
নদ-নদীগুলোর আন্তঃসংযোগ এবং দেশব্যাপী অবস্থান: কুড়িগ্রাম জেলার নদীগুলো একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত এবং এ নদীগুলো এ জেলা হতে দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এ জেলার নদীগুলো দিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে খুব কম খরচে যাতায়াত করা সম্ভব।    
বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা: কুড়িগ্রাম জেলার নদীগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। ব্রহ্মপুত্র আর ধরলার বৈরালী মাছ একান্তই এ জেলার। এ জেলার নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রুই, কাতলা, কালবাউস, পাঙ্গাস, বাটা, সরপুটি, চ্যাকা, বোয়াল, আইড় ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়।   
 
নদীভিত্তিক যোগাযোগ: নদীমাতৃক বাংলাদেশের এ জেলাটি ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত । এ জেলার অনেক মানুষ নদীর উপর নির্ভরশীল এবং নদীকে কেন্দ্র করে তাদের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয়। এখানকার মানুষ খুব সহজেই নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতে পারে।  চিলমারী বন্দর হতে নদীপথে ব্রহ্মপুত্র হয়ে যমুনা দিয়ে গোয়ালন্দের তীরে পদ্মা নদীতে যাওয়া যায়। একই পথে মেঘনা হয়ে নদীপথে চট্রগ্রাম ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে যাতায়াত করা যায়। ভারতের জাহাজও এই পথে আসামের শীলঘাট থেকে চাঁদপুর-বরিশাল হয়ে কলকাতা যায়। এছাড়াও ভারত বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্ট আমদানী করে এই রুট দিয়ে। 
 
কম খরচে যাতায়াত: নদীপথে  খুব সুলভে একস্থান হতে আরেক স্থানে যাতায়াত করা যায়। এ জেলা থেকে নদীপথে খুব কম খরচে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করা যায়। 
 
শান্ত নদী প্রবাহ: বছরের অধিকাংশ সময়ই কুড়িগ্রাম জেলার নদ-নদীগুলোর প্রবাহ শান্ত থাকে । শান্ত প্রবাহের কারণে নদীপথে নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা খুবই নগন্য।
 

খ) দুর্বলতা: 

শিল্পীদের বিকাশে যথেষ্ট উদ্যোগের অভাব: ভাওয়াইয়া গানের শিল্পীদের বিকাশে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। শিল্পীদের বিকাশের প্রধান উদ্দেশ্য হলো পুরনো শিল্পীদের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় সৃষ্টিশীল নতুন শিল্পীদের তুলে ধরা।

গান সংগ্রহের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই: ভাওয়াইয়া গান সংগ্রহের লক্ষ্যে এ অঞ্চলে তেমন উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।  

ভাওয়াইয়া গান নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই: বাংলা লোকসংগীতের বিশাল ভাণ্ডারের একটি শক্তিশালী সম্পদ ভাওয়াইয়া গান নিয়ে পর্যাপ্ত চর্চা, গবেষণা ও প্রচার-প্রসারের আয়োজন কম।  

শিল্পীদের যথেষ্ট স্বীকৃতি নেই: ভাওয়াইয়া গানের শিল্পীদের স্বীকৃতি প্রদানে যথেষ্ট অভাব রয়েছে। স্বীকৃতি না থাকায় এ গান নিয়ে শিল্পীদের আগ্রহ কমে যায়।

প্রচার-প্রসারের অভাব: ভাওয়াইয়া গান জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে এর প্রচার ও প্রসারের ঘাটতি রয়েছে। লোকসংগীতের জনপ্রিয় এ ধারাটি প্রচারের অভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে এর যথাযথ পরিচিতি হতে পারছে না। ফলে মানুষের জীবনধারায় কখনো কখনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। 

নদীর গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন: এ জেলার নদীগুলোর গতিপথ দ্রুত পরিবর্তনশীল। গতিপথ পরিবর্তনের ফলে শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে নদীর মাঝে চর পড়ে ও দু’দিকে বিস্তৃত হয়ে যায়।

নদীভাঙ্গন: নদীভাঙ্গন এ জেলার একটি বড় সমস্যা । প্রতিবছর বর্ষায় নদীভাঙ্গন তীব্র হয়। ভাঙ্গনে বিলীন হয় অনেক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

আকস্মিক বন্যা:  এ জেলায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নদী তীরবর্তী গ্রাম ও নিম্নাঞ্চলে দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা। আকস্মিক বন্যায় কৃষি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হয়, পানিবন্দী হয়ে পড়ে মানুষের জীবন। হঠাৎ ভাঙ্গনে সহায় সম্বল হারায় অনেক মানুষ।

 

গ) সম্ভাবনা: 

ভাওয়াইয়া গানের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণ: বাংলাদেশের উত্তর জনপদের আঞ্চলিক ভাষার গান ভাওয়াইয়া। এ গানে এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার হৃদয়স্পর্শী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এ গানগুলো জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ: ভাওয়াইয়া লোকসঙ্গীতের ধারায় এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন পেশার মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসা,  বিরহ-বেদনাকে আশ্রয় করে লোকের মুখে মুখে রচিত এবং বিপুল আবেদনময় সুরে বাঁশি ও দোতরার মতো বাদ্যযন্ত্রযোগে গীত হয়ে আসছে। এর মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

ভাওয়াইয়া গানের দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা সৃষ্টি: ভাওয়াইয়া গান মানুষের প্রাণের গান, এ গানগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতি, জনপদের জীবনযাত্রা, তাদের কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক ঘটনাবলী ইত্যাদির সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে। তাই বলা যায় ভাওয়াইয়া গান মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলে তা মানুষ গ্রহণ করবে এবং তা আবার জনপ্রিয়তা লাভ করবে। 

নদী-বন্দর স্থাপন: ইতোমধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের ঐতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দর সরকারীভাবে নদীবন্দর হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসাবে চালু হলে দেশের অন্যান্য স্থানের সাথে এ জেলার সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পণ্য আদান-প্রদান করার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। 

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ: নদীপথে পণ্য আনা নেয়ায় ব্যয় কম হওয়ায় এখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবীরা লাভবান হবে । কম খরচে পণ্য আনা নেয়ার ফলে স্থানীয় বাজারেও পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য সামগ্রীর যোগান থাকবে এবং মূল্যস্তরও সহনীয় থাকবে।

চরভিত্তিক কৃষিকাজ ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশ: নদীর গতিপথ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়ে নদীর মাঝে অসংখ্য চর পড়ে যাওয়ায় চরে কৃষিকাজ করে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। চরকে কেন্দ্র করে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভবপর হবে।

নদী গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন: যেহেতু এই জেলা দিয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক নদীসহ অনেকগুলো নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে তাই এ জেলার নদী নিয়ে গবেষণার জন্য একটি নদী গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।  

চরভিত্তিক ও বন্যাসহিঞ্চু ফসলের জাত উদ্ভাবন: নদীবেষ্টিত এ জেলায় চরাঞ্চলে ফসলের চাষাবাদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বন্যা-সহিঞ্চু ফসলের জাত উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে। এতে করে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবেনা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। 

পলিবাহিত জমির উর্বরতা: এ জেলার নদ-নদীগুলো উজান থেকে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করে নিয়ে আসে। জমির উর্বরতাকে কাজে লাগিয়ে পলিমাটিতে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব এবং ফসল উৎপাদনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব। 

 


   ঘ) ঝুঁকি: 

নতুন প্রজন্মের ভাওয়াইয়া গানের পরিচিতির অভাব: নতুন প্রজন্ম ভাওয়াইয়া গানের সাথে যথেষ্ট পরিচিত না। অন্যান্য গানের ভীড়ে ভাওয়াইয়া গান বর্তমান সময়ে ততটা প্রচারণা না পাওয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে এ গানের পরিচিতির অনেকটা অভাব রয়েছে।

ফিউশন (রক গানের প্রভাব): বর্তমান সময় বিভিন্ন সংস্কৃতির গান দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এইসব গানের প্রভাবে ভাওয়াইয়া গান ততটা বিস্তার লাভ করতে পারছে না।

নদ-নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব: নদীশাসন ও নদীরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে এ জেলার ছোট বড় অসংখ্য নদ-নদীগুলো হয়ে পড়ছে অরক্ষিত। ফলে প্রতিনিয়ত নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আকস্মিক নদী ভাঙ্গন ও বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নদী তীরবর্তী লোকালয়।

অপ্রতুল টেকসই বাঁধ: যথাযথ নদী শাসনের জন্যে এ জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ টেকসই বাঁধ নেই। এ জেলায় নদ-নদীর সংখ্যার তুলনায় বাঁধের সংখ্যা অপ্রতুল। লোকালয় ও শহর রক্ষা বাঁধের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ার কারণে প্রতিবছর বন্যা তীব্র রূপ ধারণ করে।  

যথেষ্ট বিনিয়োগের অভাব: এ জেলায় নদীশাসন ও বাঁধ নির্মাণে যথেষ্ট বিনিয়োগের অভাব থাকার ফলে প্রতিবছর নদীভাঙ্গন, বন্যায় মানুষের প্রচুর পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)